নাড়ির টানে বাড়ি ফেরা: ঈদযাত্রার শুরুতেই মহাসড়কে মাইলের পর মাইল যানজট, চরম ভোগান্তি
- পোষ্ট টাইম : 2026-05-27 11:24:15
- 913 বার পঠিত
আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানি ঈদকে কেন্দ্র করে রাজধানী ছাড়তে শুরু করেছে লাখ লাখ মানুষ। প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে নাড়ির টানে ঘরমুখো মানুষের এই ঢল নামার পর পরই দেশের প্রধান প্রধান মহাসড়কগুলোতে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র যানজট। অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ এবং কিছু কিছু জায়গায় রাস্তা সংস্কার ও ধীরগতির কারণে ঢাকা-টাঙ্গাইল এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে মাইলের পর মাইল জুড়ে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে। ফলে ঈদযাত্রার শুরুতেই চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রী ও চালকেরা।
দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের প্রবেশদ্বার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে গতকাল রাত থেকেই যানবাহনের চাপ বাড়তে থাকে। আজ সকালের দিকে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া অংশে যানবাহনের চাপ তীব্র আকার ধারণ করে। মেঘনা সেতু থেকে শুরু করে দাউদকান্দি পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় তৈরি হয়েছে দীর্ঘ যানজট।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই স্থানে দাঁড়িয়ে আছে শত শত যাত্রীবাহী বাস, প্রাইভেটকার এবং কোরবানির পশুবাহী ট্রাক। তীব্র গরমে বাসের ভেতর আটকে থাকা শিশু ও বৃদ্ধরা চরম হাঁসফাঁস করছেন। হাইওয়ে পুলিশ জানায়, ঈদকে সামনে রেখে ঢাকা ছাড়ার গাড়ির সংখ্যার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ঢাকা অভিমুখে আসা পশুবাহী ট্রাকের সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে। অতিরিক্ত এই গাড়ির চাপ এবং টোল প্লাজাগুলোতে ধীরগতির কারণে গজারিয়া অংশে এই অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
উত্তরবঙ্গের ১৬ জেলার প্রবেশপথ ঢাকা-টাঙ্গাইল ও বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়কেও একই চিত্র দেখা গেছে। চন্দ্রা মোড় থেকে শুরু করে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা এবং বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব পাড় পর্যন্ত বিভিন্ন পয়েন্টে থেমে থেমে চলছে যানবাহন। বিশেষ করে কালিয়াকৈর, মির্জাপুর ও জোকারচর এলাকায় গাড়ির গতি নেমে এসেছে শূন্যের কোঠায়।
পরিবহন চালকেরা জানিয়েছেন, অন্যান্য সময়ের চেয়ে এখন মহাসড়কে গাড়ির সংখ্যা চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি। এর ওপর অনেক চালক উল্টো পথে গাড়ি চালানোর চেষ্টা করায় যানজট আরও প্রকট রূপ নিচ্ছে। উত্তরবঙ্গগামী একটি বাসের যাত্রী সাফি আহমেদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "ঢাকা থেকে রওনা দিয়ে চন্দ্রা পার হতেই চার ঘণ্টা লেগে গেছে। গরমে বাসের ভেতরে থাকা দায়। প্রতি বছরই ঈদের আগে একই ভোগান্তি পোহাতে হয়, কিন্তু স্থায়ী কোনো সমাধান দেখি না।"
মহাসড়কের যানজটের পাশাপাশি আজ সকাল থেকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শুরু হওয়া কালবৈশাখী ঝড় ও বৃষ্টি ঘরমুখো মানুষের ভোগান্তি আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বৃষ্টির কারণে মহাসড়কের অনেক জায়গায় গাড়ির গতি কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন চালকেরা। সড়ক পিচ্ছিল থাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে। এছাড়া বৃষ্টির পানি জমে থাকা এবং মহাসড়কের পাশে বসা পশুর হাটের কারণেও অনেক জায়গায় স্বাভাবিক যানচলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোরবানি ঈদের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো পশুবাহী ট্রাকের ব্যবস্থাপনা। রাজধানী ও এর আশেপাশের হাটগুলোকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার পশুবাহী ট্রাক দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসছে। মহাসড়কে এই সব ধীরগতির ট্রাক এবং ফিটনেসবিহীন কিছু গাড়ি বিকল হয়ে যাওয়ার কারণেও হঠাৎ হঠাৎ দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। তাছাড়া হাইওয়ের পাশে যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা করানোর ফলেও পেছনের গাড়িগুলো আটকে যাচ্ছে।
মহাসড়কের এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করে যাচ্ছে হাইওয়ে পুলিশ ও জেলা পুলিশ। হাইওয়ে পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, "ঈদযাত্রীদের নিরাপত্তা এবং যানজট নিরসনে মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। ড্রোন ও সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। উল্টো পথে গাড়ি চালানো এবং যত্রতত্র পার্কিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আশা করা যাচ্ছে, বিকেলের মধ্যে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হবে।"
তবে প্রশাসনের এই আশ্বাসের পরও সাধারণ মানুষের শঙ্কা, ঈদের ছুটি পুরোপুরি শুরু হলে আগামী দিনগুলোতে মহাসড়কে গাড়ির চাপ আরও বাড়বে। আর তখন যদি ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে এই ভোগান্তি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। ঘরমুখো মানুষের দাবি, প্রশাসন যেন কেবল আশ্বাস না দিয়ে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে কঠোর অবস্থান নেয়।