কালবৈশাখীর তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড জনজীবন: পাটুরিয়া-দৌলতদিয়ায় ফেরি চলাচল বন্ধ, ঘাটে চরম ভোগান্তি
- পোষ্ট টাইম : 2026-05-27 11:37:42
- 904 বার পঠিত
ভোর থেকেই মেঘে ঢাকা আকাশ, আর সকাল হতেই শুরু হয় মুষলধারে বৃষ্টি ও কালবৈশাখী ঝড়ের তাণ্ডব। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আজ সকাল থেকে বয়ে যাওয়া এই আকস্মিক ঝড়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক জনজীবন। বৈরী আবহাওয়ার কারণে নদী উত্তাল থাকায় দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে সাময়িকভাবে ফেরি ও লঞ্চসহ সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ। এর ফলে ঘাট এলাকায় আটকা পড়েছে শত শত যানবাহন, যা ঈদযাত্রার শুরুতেই ঘরমুখো মানুষের ভোগান্তিকে চরম পর্যায়ে নিয়ে গেছে।
আজ সকাল থেকেই ঢাকার আকাশ অন্ধকার হয়ে আসে। সকাল সাড়ে ৭টার দিকে শুরু হয় তীব্র ঝোড়ো হাওয়া, যার গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৬০ থেকে ৭০ কিলোমিটার। এর সাথে যোগ হয় বজ্রপাত ও ভারী বর্ষণ। ঝড়ের কারণে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় রাস্তার পাশের গাছের ডালপালা ভেঙে পড়েছে, কোথাও কোথাও সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
সকালবেলায় আকস্মিক এই ঝড়ের কারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন অফিসগামী মানুষ এবং ঈদ উপলক্ষে গ্রামে রওনা হওয়া যাত্রীরা। গণপরিবহনের সংকট এবং তীব্র বৃষ্টির কারণে অনেকেই দীর্ঘক্ষণ বাসস্ট্যান্ডগুলোতে আটকে থাকেন। ঢাকা ছাড়াও গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর এবং রাজবাড়ীসহ দেশের মধ্য ও পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে কালবৈশাখী ঝড়ের তাণ্ডবের খবর পাওয়া গেছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর নদী বন্দরগুলোর জন্য ২ নম্বর নৌ হুঁশিয়ারি সংকেত জারি করায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে সকাল ৮টা থেকে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে ফেরি ও লঞ্চ চলাচল সাময়িকভাবে সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয় বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্পোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি)।
পদ্মা নদী প্রচণ্ড উত্তাল থাকায় এবং তীব্র ঢেউয়ের কারণে ফেরিগুলো পন্টুনে ভিড়তে পারছিল না। বিআইডব্লিউটিসি’র আরিচা কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, "ঈদের কারণে যাত্রী ও যানবাহনের চাপ এমনিতেই বেশি। কিন্তু নদী উত্তাল থাকায় ঝুঁকি নিয়ে ফেরি চালানো সম্ভব নয়। যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থেই সাময়িকভাবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে আবার ফেরি চলাচল শুরু হবে।"
নৌরুট বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পরই পাটুরিয়া ও দৌলতদিয়া—উভয় ঘাটে যানবাহনের লাইন দীর্ঘ হতে শুরু করে। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের উথলী মোড় পর্যন্ত প্রায় ৭ কিলোমিটার জুড়ে আটকে পড়েছে যাত্রীবাহী বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি এবং পশুবাহী ট্রাক।
বৃষ্টির মধ্যে ঘাটে আটকে থাকা যাত্রীদের ভোগান্তি এখন চরমে। বিশেষ করে নারী, শিশু ও বয়োবৃদ্ধরা চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। দক্ষিণবঙ্গগামী একটি বাসের যাত্রী রাবেয়া খাতুন বলেন, "ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাচ্ছি। সকাল থেকে বৃষ্টি আর ঝড়ের কারণে গাড়ি নড়ছেই না। ঘাটের কাছে এসে শুনলাম ফেরি বন্ধ। বৃষ্টির মধ্যে বাচ্চাদের নিয়ে বাসের ভেতর বসে থাকা দমবন্ধকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে।"
অন্যদিকে, কোরবানির পশুবাহী ট্রাকের চালকেরা পড়েছেন মহাবিপদে। দীর্ঘ সময় ঘাটে আটকে থাকায় এবং বৃষ্টির কারণে ট্রাকে থাকা গরুগুলোর অসুস্থ হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, পশ্চিমা লঘুচাপের বর্ধিতাংশ পশ্চিমবঙ্গ ও তৎসংলগ্ন বাংলাদেশে অবস্থান করছে। এর প্রভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কালবৈশাখী ঝড় ও ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় দেশের কোথাও কোথাও অস্থায়ীভাবে দমকা বা ঝোড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। নদী বন্দরগুলোকে সতর্ক থাকার পাশাপাশি ছোট ছোট নৌযানগুলোকে আপাতত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিকেলের দিকে ঝড়ের তীব্রতা কিছুটা কমলে ধীরগতিতে ফেরি চলাচল শুরু হলেও, সকালের এই অচলাবস্থার কারণে তৈরি হওয়া জট কাটতে দীর্ঘ সময় লাগবে বলে মনে করছে ঘাট কর্তৃপক্ষ। ঘরমুখো মানুষের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে ঘাট এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ ও উদ্ধারকারী দল প্রস্তুত রাখা হয়েছে।