সংবিধানে ফিরল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও গণভোট: হাইকোর্টের রায় বহাল রাখলেন আপিল বিভাগ
- পোষ্ট টাইম : 2026-07-10 13:13:38
- 7462 বার পঠিত
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক অর্জিত হলো। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল করে হাইকোর্টের দেওয়া রায় বহাল রেখেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। এর ফলে সংবিধানে নির্বাচনকালীন 'তত্ত্বাবধায়ক সরকার' ব্যবস্থা এবং জনমত যাচাইয়ের অন্যতম গণতান্ত্রিক মাধ্যম 'গণভোট' (Referendum) চূড়ান্তভাবে পুনর্বহাল হলো।
প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ আজ এই ঐতিহাসিক আদেশ ঘোষণা করেন। দেশের শীর্ষ আদালত হাইকোর্টের রায়কে অক্ষুণ্ন রেখে রাষ্ট্রপক্ষ ও লিভ টু আপিলকারীদের আবেদন খারিজ করে দেন। এই রায়ের ফলে ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাদ পড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা দেশের সর্বোচ্চ আইন বা সংবিধানে পূর্ণ মর্যাদায় ফিরে এল।
আজকের শুনানিতে আদালত উল্লেখ করেন, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থা এবং গণভোটের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিধানগুলো বাতিল করা হয়েছিল, যা দেশের গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা এবং জনগণের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। আদালত তার পর্যবেক্ষণে বলেন, একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য এবং জনগণের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই।
এর আগে, দেশের বিশিষ্ট আইনজীবী এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের দায়ের করা রিট পিটিশনের চূড়ান্ত শুনানি শেষে হাইকোর্ট পঞ্চদশ সংশোধনীকে অবৈধ ও অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করেছিলেন। তৎকালীন সরকারের আমলে পাস হওয়া এই সংশোধনীকে দেশের সংবিধানের মূল কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে অভিহিত করা হয়েছিল। আপিল বিভাগ আজ সেই রায়কেই চূড়ান্ত অনুমোদন দিলেন।
এই রায়ের অন্যতম প্রধান দিক হলো 'গণভোট' ব্যবস্থার প্রত্যাবর্তন। সংবিধানের কোনো মৌলিক ধারা পরিবর্তন বা দেশের জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ে জনগণের সরাসরি মতামত গ্রহণের জন্য সংবিধানে গণভোটের বিধান ছিল। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এটি বাতিল করা হয়েছিল। আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গণভোটের বিধান ফিরে আসায় রাষ্ট্রের যেকোনো বড় নীতিগত সিদ্ধান্তে জনগণের প্রত্যক্ষ অংশীদারিত্ব নিশ্চিত হবে, যা গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করবে।
আপিল বিভাগের এই যুগান্তকারী রায়কে স্বাগত জানিয়েছে দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ এবং সাধারণ মানুষ। দীর্ঘ দিন ধরে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে আন্দোলনরত দলগুলো এই রায়কে "জনগণের দীর্ঘ সংগ্রামের বিজয়" বলে অভিহিত করেছে।
বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বিরোধী দলগুলোর শীর্ষ নেতারা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, এই রায়ের মাধ্যমে দেশে আবার একটি অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ ফিরে আসবে। এর ফলে ভবিষ্যতে যেকোনো জাতীয় নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনে নয়, বরং সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও অরাজনৈতিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হতে বাধ্য। তারা মনে করেন, এই রায় দেশের রাজনৈতিক সংকট নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকা রাখবে।
অন্যদিকে, সাধারণ নাগরিকদের মধ্যেও এই রায় নিয়ে ব্যাপক ইতিবাচক সাড়া দেখা গেছে। সচেতন মহল মনে করছেন, ভোটের অধিকার ফিরে পাওয়ার ক্ষেত্রে এটি একটি বড় পদক্ষেপ।
আদালতের এই চূড়ান্ত রায়ের পর এখন পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন কীভাবে এবং কোন রূপরেখায় অনুষ্ঠিত হবে, তা নিয়ে আইনি ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু হবে। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেহেতু আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বহাল রেখেছেন, তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা এখন দেশের কার্যকর আইনের অংশ। পরবর্তী সংসদ ভেঙে দেওয়ার পর সংবিধানের পূর্ববর্তী (ত্রয়োদশ সংশোধনীর আলোকে) নিয়ম অনুযায়ী একটি অন্তর্বর্তীকালীন বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হবে, যার একমাত্র কাজ হবে ৯০ দিনের মধ্যে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দেওয়া।
পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের এই চূড়ান্ত রায় বাংলাদেশের বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি অনন্য নজির হয়ে থাকবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই রায়ের ফলে দেশের রাজনীতিতে যে দীর্ঘস্থায়ী অবিশ্বাস ও অচলাবস্থা ছিল, তা দূর হওয়ার পথ সুগম হলো। এখন দেখার বিষয়, এই রায়ের আলোকে নির্বাচন কমিশন এবং রাজনৈতিক দলগুলো আগামী দিনের নির্বাচনী রূপরেখা বাস্তবায়নে কীভাবে এগিয়ে যায়।