কমছেই না ভয়াবহতা: দেশে হাম ও উপসর্গে শিশুমৃত্যু ৪০০ পার, হাসপাতালগুলোতে জরুরি প্রস্তুতি
- পোষ্ট টাইম : 2026-05-16 19:01:13
- 4211 বার পঠিত
দেশজুড়ে সংক্রামক ব্যাধি হাম ও হামের উপসর্গের ভয়াবহতা কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না। গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাবের দুই মাসের মাথায় এসে দেশে মোট শিশুমৃত্যুর সংখ্যা ৪৫০ ছাড়িয়ে গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ২ শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। একই সময়ে নতুন করে ১ হাজার ৬৯ জন শিশুর শরীরে এই রোগের উপসর্গ দেখা দিয়েছে এবং ১০৮ জনের ল্যাবরেটরি টেস্টে নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে।
চলতি বছরের প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত সারা দেশে আক্রান্তের সংখ্যা ৫৬ হাজার ৫৭২ জন ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে ৭ হাজার ৫২৪ জনের। উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় সারা দেশের হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ২৪ ঘণ্টা জরুরি সেবা দিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বিশেষ হেল্পলাইন চালু করেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত দুই মাসে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪১ হাজারেরও বেশি শিশু। এর মধ্যে ৩৬ হাজার ৬৪৫ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও এখনো হাজার হাজার শিশু চিকিৎসাধীন। সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে ঢাকা, সিলেট, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিভাগে। ঢাকার ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, কামরাঙ্গীরচর ও মিরপুরের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এবং নিম্নআয়ের মানুষ অধ্যুষিত এলাকাগুলো হামের বড় ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দেশের সব মেডিকেল কলেজ ও জেলা সদর হাসপাতালগুলোতে হাম আক্রান্ত শিশুদের জন্য বিশেষ 'আইসোলেশন ওয়ার্ড' খোলার নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রগুলোতে (ICU) ভেন্টিলেটর এবং পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের একাংশের ছুটি বাতিল করে সার্বক্ষণিক রোস্টারের মাধ্যমে চিকিৎসা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
কোনো শিশুর শরীরে হামের লক্ষণ দেখা দিলে অভিভাবকেরা যাতে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারেন, সেজন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ২৪ ঘণ্টার জন্য বিশেষ হেল্পলাইন চালু করেছে। সাধারণ মানুষ এখন থেকে ১৬২৬৩ (স্বাস্থ্য বাতায়ন) অথবা ৩৩৩ নম্বরে কল করে হামের লক্ষণ, আইসোলেশন পদ্ধতি এবং নিকটস্থ হাসপাতালের শয্যা খালি থাকার তথ্য জানতে পারছেন। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, আক্রান্ত শিশুদের ঘরে রেখে সঠিক পরিচর্যা, তরল খাবার নিশ্চিত করা এবং জটিলতা দেখা দিলে অবিলম্বে হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে এই হেল্পলাইন থেকে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং ইউনিসেফের (UNICEF) দেওয়া প্রতিবেদন অনুযায়ী, আক্রান্ত শিশুদের প্রায় ৭৯ শতাংশই ৫ বছরের কম বয়সী শিশু। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত দুই বছর ধরে দেশের টিকাদান কর্মসূচিতে এক ধরনের স্থবিরতা দেখা দিয়েছিল। বিশেষ করে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক বাজার ও অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনার কারণে হাম-রুবেলা (MR) টিকার তীব্র সংকট তৈরি হয়। এর ফলে লাখ লাখ শিশু রুটিন টিকাদান থেকে বাদ পড়ে যায়, যা বর্তমান প্রাদুর্ভাবের প্রধান কারণ।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ জানান, "একটি বড় সময় ধরে শিশুদের প্রয়োজনীয় প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটি তৈরি না হওয়ায় এই বিপর্যয় ঘটেছে। তাছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির কারণে নিম্নআয়ের পরিবারগুলোতে মা ও শিশুদের মধ্যে তীব্র অপুষ্টি দেখা দিয়েছে। অপুষ্টির কারণে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ায় হাম দ্রুত নিউমোনিয়া বা মারাত্মক জটিলতার রূপ নিচ্ছে এবং মৃত্যুর হার বাড়ছে।"
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহায়তায় ইতিমধ্যে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে। এ পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে জরুরি ভিত্তিতে এক ডোজ করে হামের টিকা দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, দেশের শতভাগ শিশুকে টিকার আওতায় না আনা পর্যন্ত এই বিশেষ ক্যাম্পেইন অব্যাহত থাকবে। চিকিৎসকদের আশা, আগামী ৩ থেকে ৪ সপ্তাহের মধ্যে এই গণ-টিকাদানের সুফল মিলবে এবং আক্রান্তের গ্রাফ নিচের দিকে নামতে শুরু করবে।