বাংলাদেশে চলমান হাম (Measles) পরিস্থিতি বর্তমানে একটি জনস্বাস্থ্য উদ্বেগ হিসেবে দাঁড়িয়েছে
- পোষ্ট টাইম : 2026-05-27 11:43:58
- 925 বার পঠিত
১. বর্তমান পরিস্থিতি ও পরিসংখ্যান
গত ১৫ মার্চ দেশে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে হামের প্রাদুর্ভাব শনাক্ত হওয়ার পর থেকে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে:
শনাক্ত ও আক্রান্ত: এ পর্যন্ত সারা দেশে ৬৬ হাজারেরও বেশি শিশুর মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা গেছে, যার মধ্যে ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় ৮ হাজার ৭ শতাধিক শিশুর শরীরে নিশ্চিতভাবে হামের ভাইরাসের উপস্থিতি মিলেছে।
মৃত্যুর হার: গত ৭২ দিনে হাম ও এর তীব্র উপসর্গে মোট মৃত্যুর সংখ্যা সাড়ে পাঁচশ ছাড়িয়ে গেছে। গত ২৪ ঘণ্টাতেই আরও ১০ শিশুর মৃত্যুর খবর এসেছে।
হাসপাতালে চাপ: সরকারি হাসপাতালগুলোতে ইতোমধ্যে ৫০ হাজারেরও বেশি শিশু চিকিৎসা নিয়েছে। শয্যা সংকটের কারণে অনেক হাসপাতালে মেঝেতে রেখেও শিশুদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগে সংক্রমণের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি।
২. পরিস্থিতি অবনতির প্রধান কারণসমূহ
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আকস্মিক মহামারি সদৃশ পরিস্থিতির পেছনে মূলত টিকাদানের ঘাটতি দায়ী:
টিকাদানের স্থবিরতা: বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৮ মাসের শাসনামলে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে বড় ধরনের স্থবিরতা দেখা দিয়েছিল। সময়মতো টিকার চালান না আসা এবং মাঠপর্যায়ে ক্যাম্পেইন ব্যাহত হওয়ায় প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ লাখ শিশু হামের প্রতিষেধক (এমআর টিকা) থেকে বঞ্চিত হয়।
রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার অভাব: বিপুল সংখ্যক শিশু টিকার আওতার বাইরে থাকায় তাদের শরীরে এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠেনি, যার ফলে রোগটি অতি দ্রুত বাতাসের মাধ্যমে ছড়াচ্ছে।
দেরিতে চিকিৎসা নেওয়া: অনেক অভিভাবক হামের লক্ষণগুলোকে সাধারণ জ্বর বা অ্যালার্জি মনে করে ঘরে বসেই চিকিৎসা দিচ্ছেন। রোগটি যখন নিউমোনিয়া, সেপসিস বা তীব্র শ্বাসকষ্টের মতো জটিল পর্যায়ে চলে যাচ্ছে, তখন হাসপাতালে আনার কারণে মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ছে।
৩. হামের প্রধান লক্ষণসমূহ
হাম মূলত একটি ভাইরাসজনিত অতি সংক্রামক রোগ। এর প্রধান লক্ষণগুলো হলো:
তীব্র জ্বর এবং সাথে অনবরত সর্দি-কাশি।
চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং চোখ দিয়ে পানি পড়া।
জ্বর শুরুর ৩-৪ দিন পর কান ও মুখের চারপাশ থেকে শুরু করে সারা শরীরে লালচে দানা বা র্যাশ (Rash) ছড়িয়ে পড়া।
৪. চিকিৎসকদের জরুরি পরামর্শ ও করণীয়
হাম থেকে শিশুদের রক্ষা করতে এবং জটিলতা এড়াতে চিকিৎসকেরা ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নিচের পরামর্শগুলো দিচ্ছেন:
অবিলম্বে টিকা দেওয়া: যে সব শিশু এখনও হামের টিকা (MR Vaccine) পায়নি, তাদের দ্রুততম সময়ে নিকটস্থ টিকাদান কেন্দ্রে নিয়ে টিকা নিশ্চিত করতে হবে।
আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখা (Isolation): হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে। তাই আক্রান্ত শিশুকে সুস্থ শিশুদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ঘরে রাখতে হবে এবং তার ব্যবহৃত থালা-বাসন, কাপড় আলাদা করতে হবে।
পুষ্টিকর খাবার ও তরল: আক্রান্ত শিশুকে পর্যাপ্ত পরিমাণে তরল খাবার, ডাবের পানি, স্যুপ এবং মায়ের দুধ (বুকের দুধ খাওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে) দিতে হবে।
ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আক্রান্ত শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়াতে হবে, যা হামের কারণে হওয়া অন্ধত্ব ও অন্যান্য জটিলতা প্রতিরোধ করে।
হাসপাতালে নেওয়া: শিশুর তীব্র শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি, অবিন্যস্ত আচরণ বা অতিরিক্ত পাতলা পায়খানা হলে এক মুহূর্ত দেরি না করে নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।
সতর্কতা: সামনে ঈদের ছুটির কারণে মানুষের ব্যাপক যাতায়াত ও জনসমাগম বাড়বে, যা এই সংক্রামক রোগটি আরও ছড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে। তাই শিশুদের সুরক্ষায় এই মুহূর্তে বাড়তি সতর্কতা ও সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি।